প্রাচীন শাসনামলে বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে বিভিন্ন রাজবংশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
মৌর্য সাম্রাজ্য
ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম সাম্রাজ্যের নাম মৌর্য সাম্রাজ্য।
চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য (খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৪ - ৩০০ অব্দ) মগধের সিংহাসনে আরোহণের মাধ্যমে ভারতে মৌর্য সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ভারতের প্রথম সম্রাট। পাটলিপুত্র ছিল তাঁর রাজধানী। তিনি চাণক্য নামে তক্ষশীলার এক তীক্ষ্ম বুদ্ধিসম্পন্ন ব্রাহ্মণকে তাঁর প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করেন। তক্ষশীলা নগরী ছিল অধুনা পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশে অবস্থিত একটি প্রাচীন বিদ্যাচর্চার কেন্দ্র। চাণক্যের বিখ্যাত ছদ্মনাম কৌটিল্য, যা তিনি তাঁর বিখ্যাত সংস্কৃত গ্রন্থ 'অর্থশাস্ত্র' এ গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রশাসন ও কূটনীতিকৌশলের সার সংক্ষেপ এই অর্থশাস্ত্র। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য আলেকজান্ডারের সেনাপতি সেলিউকাসকে পরাজিত করে উপমহাদেশ হতে গ্রিকদের তাড়িয়ে দেন।
সম্রাট অশোক (খ্রিষ্টপূর্ব ২৭৩- ২৩২ অব্দ) এর রাজত্বকালে উত্তর বাংলায় মৌর্য শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। অঞ্চলটি মৌর্যদের একটি প্রদেশে পরিণত হয়েছিল। প্রাচীন পুণ্ড্রনগর ছিল এ প্রদেশের রাজধানী। 'কলিঙ্গের যুদ্ধ' সম্রাট অশোকের জীবনে ছিল এক মাইলস্টোন। যুদ্ধে কলিঙ্গ রাজ সম্পূর্ণ পরাজিত হন এবং এক লক্ষ লোক নিহত হয়। কলিঙ্গ যুদ্ধের রক্তস্রোত অশোকের মনে গভীর বেদনার রেখাপাত করে। তখন কৃতকর্মের অনুশোচনায় মূহ্যমান অশোক বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করেন। তাঁর শাসনামলে বৌদ্ধধর্ম রাজধর্ম হিসাবে স্বীকৃতি পায়। তাঁর চেষ্টায় বৌদ্ধধর্ম বিশ্বধর্মের মর্যাদা পায়। এজন্য তাঁকে 'বৌদ্ধধর্মের কনস্ট্যানটাইন' বলা হয়।
রামাবতী ছিল বাংলার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাচীন নগরী। এটি পাল রাজবংশের অন্যতম শক্তিশালী শাসক রাজা রামপাল কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং তার রাজধানী হিসেবে ব্যবহৃত হতো। রামাবতী তার সৌন্দর্য এবং কৌশলগত অবস্থানের জন্য পরিচিত ছিল।
অবস্থান ও প্রতিষ্ঠা
রামাবতী নগরী ভাগীরথী নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত ছিল। কিছু সূত্রমতে, এটি বর্তমান রামপালের সাথে সংযুক্ত। শহরটি রাজা রামপাল (আনুমানিক ১০৭৭-১১২৯ খ্রিষ্টাব্দ) প্রতিষ্ঠা করেন এবং এটিকে তিনি তাঁর রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলেন। প্রাচীন নথি অনুযায়ী, রামাবতীকে রামপাল এবং সমতট রাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজধানী হিসেবেও উল্লেখ করা হয়।
সেন আমলে নবদ্বীপ বাংলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হয়। সেন রাজবংশের শাসনামলে (খ্রিষ্টীয় একাদশ–দ্বাদশ শতক) নবদ্বীপ ছিল বাংলার রাজধানী। বিশেষত লক্ষণ সেনের আমলে নবদ্বীপ প্রশাসনিক কেন্দ্রের পাশাপাশি সংস্কৃত শিক্ষা, ধর্মচর্চা ও সাহিত্যচর্চার প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়। এই সময়ে নবদ্বীপে অসংখ্য টোল ও বিদ্যাপীঠ গড়ে ওঠে, যেখানে ব্যাকরণ, ন্যায়, স্মৃতি ও বেদশাস্ত্রের অধ্যয়ন হতো। সেন আমলে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রভাব বৃদ্ধি পায় এবং নবদ্বীপ বাংলার হিন্দু সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
মলখেড (প্রাচীন নাম: মান্যখেত; প্রাকৃতে "মান্নখেড")হল ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের গুলবর্গা জেলার অন্তর্গত একটি গ্রাম। এই গ্রামটি উক্ত জেলার সেদাম তালুকে কাগিনা নদীর তীরে অবস্থিত। মলখেড ছিল খ্রিস্টীয় নবম ও দশম শতাব্দীতে রাষ্ট্রকূট রাজবংশের রাজধানী। রাষ্ট্রকূটদের পতনের পরেও পশ্চিম চালুক্য সম্রাটেরা ১০৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মলখেড থেকে রাজ্য শাসন করতেন।
পুষ্যভূতি রাজ্য
গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পর উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চলে কতকগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যের উৎপত্তি ঘটে। এদের মধ্যে বর্তমান পাঞ্জাবের পূর্বাঞ্চলে পুষ্যভূতি রাজ্যের অভ্যুদয় অন্যতম।
প্রতিহার রাজবংশ, যা গুর্জর-প্রতিহার বা কনৌজের প্রতিহার নামেও পরিচিত, মধ্যযুগীয় ভারতের একটি শক্তিশালী রাজবংশ ছিল। শুরুতে তারা গুর্জরদেশ শাসন করলেও ৮১৬ খ্রিষ্টাব্দে ত্রিপক্ষীয় সংগ্রামে বিজয় লাভের মাধ্যমে কনৌজের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়। এর ফলে প্রতিহাররা উত্তর ভারতের একটি সাম্রাজ্যবাদী শক্তিতে পরিণত হয়। রাজবংশটির বিভিন্ন শাখা উপমহাদেশের নানা অঞ্চলে ছোট ছোট রাজ্য শাসন করত, যা তাদের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারে সহায়ক ছিল।
পুষ্যভূতি রাজবংশ উত্তর ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজবংশ। এই বংশের উৎপত্তি সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য না থাকলেও ধারণা করা হয়, তাদের পূর্বপুরুষরা পূর্ব-পাঞ্জাবে বসবাস করতেন এবং পরবর্তীকালে থানেশ্বর অঞ্চলে রাজত্ব স্থাপন করেন। বাণভট্টের বিবরণ অনুযায়ী, পুষ্যভূতিই এই রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা। গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতন ও হুন আক্রমণের ফলে সৃষ্ট রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে এই বংশের উত্থান ঘটে। প্রভাকরবর্ধনের শাসনামলে (৫৮০–৬০৫ খ্রি.) পুষ্যভূতি রাজবংশ একটি শক্তিশালী সার্বভৌম রাজ্যে পরিণত হয়। হর্ষবর্ধনের মৃত্যুর পর (৬৪৭ খ্রি.) এই রাজবংশের পতন ঘটে।
পুষ্যভূতি রাজবংশের উল্লেখযোগ্য শাসক ছিলেন প্রভাকরবর্ধন, রাজ্যবর্ধন এবং হর্ষবর্ধন। প্রভাকরবর্ধন রাজ্যের ভিত্তি সুদৃঢ় করেন, রাজ্যবর্ধন স্বল্পকাল শাসন করেন এবং হর্ষবর্ধনের শাসনামলে উত্তর ভারতে রাজনৈতিক ঐক্য ও সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধি লক্ষ করা যায়। হর্ষবর্ধনের শাসনকালকে পুষ্যভূতি রাজবংশের সর্বশ্রেষ্ঠ সময় বলা হয়।
কনৌজ বা কন্নৌজ ভারতের উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের একটি প্রাচীন ও ঐতিহাসিক শহর। এর প্রাচীন নাম ছিল কান্যকুব্জ। এই শহরটি একসময় হর্ষবর্ধনের সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল এবং পরবর্তীকালে প্রতিহার রাজবংশের রাজনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কনৌজ সুগন্ধী উৎপাদন ও বাণিজ্যের জন্য বিখ্যাত এবং হিন্দি ভাষার কনৌজি উপভাষার উৎপত্তিস্থল হিসেবেও পরিচিত। প্রাচীন ভারতের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে কনৌজের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কুষাণ সাম্রাজ্য
কনিষ্ক ছিলেন কুষাণ সাম্রাজ্যের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। তাঁর চিকিৎসক ছিলেন চরক।চরক আয়ুর্বেদ চিকিৎসা পদ্ধতির সংকলনগ্রন্থ রচনা করেন, যা 'চরক সংহিতা' নামে সমাধিক পরিচিত।
Read more